রাইফেল রোটি আওরাত (মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস / গ্রন্থ সমালোচনা)
*********************************************
শেষতক এই প্রশ্ন বড় জিজ্ঞাসা হয়েই রয়ে যায়, উপন্যাস ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? এ দুইয়ের বিভাজন-রেখার আদৌ কোনো সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক অবয়ব আছে কি না। লিও তলস্তয় তাঁর ওয়্যর অ্যান্ড পিস সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটা উপন্যাস নয়, এটা কাব্যের চেয়ে কম, এমনকি কম ইতিহাস থেকেও।’ উপন্যাস লিখতে গিয়ে নিশ্চয় তা ইতিহাস হয় না; আবার ইতিহাস লিখতে গিয়ে উপন্যাস হবে না। তবে এ দুইয়ের সমান্তরাল চলার আদর্শ নমুনা হতে পারে আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত। ইতিহাস ও উপন্যাসের দুটি ভিন্ন তল একে অপরের ওপর আপতিত হতে পারে এবং হওয়া সম্ভব—রাইফেল রোটি আওরাত পড়লে তা-ই মনে হয়। ১৯৭১ সালের মার্চের ইতিহাস এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে। একাত্তরের যুদ্ধকালীন, যখন অবরুদ্ধ গোটা ঢাকা, সে সময় সংগোপনে আনোয়ার পাশা লিখেছিলেন উপন্যাসটি। এটি সম্ভবত বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের প্রথম কীর্তিও বটে।
পয়লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এরপর থেকেই মূলত উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। কিন্তু এর আগের ইতিহাস তো আরও দীর্ঘ। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর—চব্বিশ বছরের ইতিহাসে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে আদর্শগত বিরোধ ও সমষ্টিগত ব্যবধান বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণে। পাকিস্তানের দুই অংশ এক থাকার সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে একাত্তরের আগেই। ক্ষমতা হস্তান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের তাই ছিল প্রবল ভীতি।
পয়লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এরপর থেকেই মূলত উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। কিন্তু এর আগের ইতিহাস তো আরও দীর্ঘ। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর—চব্বিশ বছরের ইতিহাসে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে আদর্শগত বিরোধ ও সমষ্টিগত ব্যবধান বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণে। পাকিস্তানের দুই অংশ এক থাকার সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে একাত্তরের আগেই। ক্ষমতা হস্তান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের তাই ছিল প্রবল ভীতি।
আনোয়ার পাশা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক; উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সুদীপ্ত শাহীনও তাই। ফলে স্পষ্টত রাইফেল রোটি আওরাত-এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে পঁচিশে মার্চের রাতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হত্যাযজ্ঞের বিবরণ। সুদীপ্ত শাহীনের চোখ দিয়ে আনোয়ার পাশা অবলোকন করেছেন মার্চের দম বন্ধ করা সময়কে। বিশেষত পঁচিশে মার্চের পরের দিনগুলো। ফলে পাঠকও সুদীপ্ত শাহীনের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে থাকে মার্চের ঢাকার রাস্তায়, ভাবতে থাকে কী দোষ ছিল বাঙালিদের।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারী শহীদ হন। ২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন প্রাঙ্গণে এক ছাত্র-সমাবেশে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলোতে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো ইকবাল হল থেকে, বর্তমানে যেটির নাম জহুরুল হক হল।
পঁচিশে মার্চের রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার আগে সমগ্র ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকটি দল পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল ১৮ নম্বর পাঞ্জাব, ২২ নম্বর বেলুচ, ৩২ নম্বর পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এবং কিছু সহযোগী ব্যাটালিয়ন। এই বাহিনীগুলোর অস্ত্রসম্ভারের মধ্যে ছিল ট্যাংক, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, রকেট লাঞ্চার, ভারী মর্টার, হালকা মেশিনগান ইত্যাদি। এই সব অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাকিস্তান বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। দেয়াল ভেঙে সেনাবহিনী ট্যাংক নিয়ে জগন্নাথ হলের মধ্যে প্রবেশ করে। আক্রমণ চালানো হয় ইকবাল হলেও। ওই রাতে অনেক ছাত্র শহীদ হন। হত্যা করা হয় নয়জন শিক্ষককে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলখেতের বাড়িতে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফজলুর রহমানকে তাঁর দুই আত্মীয়সহ হত্যা করা হয়। পাকিস্তানবাহিনী বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার পাশা এবং ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রাশীদুল হাসানের বাসায় প্রবেশ করে। দুই পরিবারই খাটের নিচে লুকিয়ে সেই যাত্রা প্রাণে বাঁচেন। ঘরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে তাঁদের কাউকে না দেখে হানাদাররা চলে যায়। উভয় অধ্যাপক ওই রাতে বেঁচে গেলেও, মুক্তিযুদ্ধের শেষ প্রান্তে তাঁরা আলবদর বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পারেননি।
আনোয়ার পাশার কৃতিত্ব এখানেই যে, তিনি ইতিহাসকে ধারণ করেছেন ঔপন্যাসিকের দৃষ্টি দিয়ে, ইতিহাসের লেখনী দিয়ে নয়। এই সব হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা এসেছে কাহিনির ফাঁকে ফাঁকে—ইতিহাসের একঘেয়েমি এখানে একেবারেই নেই। মানুষের প্রাণ বাঁচানের প্রচেষ্টা আর আকুতি পাঠকের দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়। কারণ রাইফেল রোটি আওরাত-এর বর্ণনা পাঠক তাঁর চোখে দেখতে পান। এমন কিছু বর্ণনা আছে যা মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগের আবেদনকে পাঠকের কাছে আরও মহান, আরও মানবীয় করে তোলে। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক অবোধ শিশুর কথা আছে যে কিনা রাস্তায় গাছের গুঁড়ির আড়ালে পড়ে থাকা তার মৃত মায়ের স্তন চুষে চলেছে। চারতলা দালানের ছাদ থেকে চুল ধরে হিঁচড়ে টেনে আনা রমণীর কথা আছে—শেষ পর্যন্ত যাঁর মাথা থেকে একগোছা চুল খুলিসহ উঠে আসে। রিকশায় নিথর পড়ে থাকা রিকশাওয়ালার কথা আছে। উপন্যাস হয়েও এগুলো ইতিহাস।
পাকিস্তানের আদর্শ, নীতি ও বোধের প্রসঙ্গগুলো মুক্তিযুদ্ধ-পূর্বকাল থেকেই তর্ক তৈরি করেছে। ধর্ম, অর্থনীতি, সংস্কৃতি কোনোটাই মুক্তি পায়নি রাজনীতি থেকে। উপন্যাসের চরিত্রগুলোর পারস্পরিক কথোপকথনে, আলাপচারিতায় তা উঠে এসেছে এবং অবশ্যই উঠে এসেছে উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের মনোদর্শনে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে পাঠ করতে হলে তাই রাইফেল রোটি আওরাতকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
Courtesy: Prothomalo
No comments:
Post a Comment