লিখিত পরীক্ষাই বিসিএসের প্রকৃত ধাপ বলা যায়। কেননা এই ধাপে এসে প্রায় সকল পরীক্ষার্থীই কল্পনার জগতে নিজে নিজে ক্যাডার হয়ে যান। নিজের দীর্ঘদিনের লালিত বাসনা বাস্তবায়নের তাড়না আর পারিপার্শ্বিকতার প্রত্যাশা মিলে একটা দৃঢ়স্বপ্ন তৈরি হয়, যা সবাইকে প্রিলিমিনারির তুলনায় বহুগুণে অধ্যবসায়ী, প্রত্যয়ী ও পরিশ্রমী করে তোলে। সেজন্য, আপনাকে এবার টিকে থাকার লড়াইয়ে আরও বেশি পরিকল্পিত, সংযমী ও গঠনমূলক হতে হবে। এমন অনেকে আছেন যারা অল্প পরিশ্রমেই ভালো ফলাফল করেন আবার অনেকেই দিন-রাত পড়াশোনা করেও প্রত্যাশিত ফলাফল পান না। কাজেই একটি সুন্দর পরিকল্পনা আপনার প্রতিযোগিতার এই অগ্নিপরীক্ষায় টিকে থাকতে অন্ধের যষ্ঠির মতো কাজ করতে পারে।
v প্রথমেই আসা যাক গণিতের ব্যাপারে......
গণিতের প্রাপ্তনম্বর আপনাকে অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখবে এটা দিবালোকের ন্যায় সত্য ও বাস্তব। বিসিএসের এই আধুনিক যুগে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য তাই পোয়াবারো। আমাদের মনে রাখতেই হবে বিসিএস (প্রিলি+লিখিত) কোনো পরীক্ষাতেই বড় কোনো সমস্যাকে সমাধান করতে বলা হয়না। কাজেই, আমাদের দৃষ্টি থাকবে একেবারেই মৌলিক গণিতের দিকে। সেজন্য বাজারের সনাতন পদ্ধতির গাইডের চেয়ে আপনাকে সহায়তা করবে বোর্ড বই। এনসিটিবি’র ষষ্ঠ থেকে দশম পর্যন্ত সাধারণ গণিত এবং উচ্চ মাধ্যমিকের উচ্চতর গণিতের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো দেখে রাখুন। পাশাপাশি গত তিন বিসিএস লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন দেখে গণিতের প্রস্তুতিকে এগিয়ে রাখুন।
v মানসিক দক্ষতায়......
এই অংশে ভালো করতে হলে আপনাকে খুব বেশি পড়তে হবেনা। প্রিলির জন্য পড়া বইগুলো একটু ঝালিয়ে নিলেই হবে, পাশাপাশি ওরাকল সিরিজের মানসিক দক্ষতার গাইড বইয়ের সহায়তা নিতে পারেন।
v বিজ্ঞান বিষয়ে......
বিজ্ঞানের তিন অংশে জটিল কোনো প্রশ্ন থাকেনা বললেই চলে, তবে আমাদের গতানুগতিক সিলেবাস বা প্রশ্নের ধারাও তেমন কাজে লাগেনা। সৃজনশীল প্রশ্ন হওয়ায় উত্তর হবে সংক্ষিপ্ত ও সারনির্ভর। বোর্ড বইয়ের মাধ্যমিক শাখার সাধারণ বিজ্ঞান বই, উচ্চ মাধ্যমিকের পদার্থ বিজ্ঞান বই, দশম ও একাদশের আইসিটি বই থেকে সিলেবাস দেখে সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের উপর সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির আলোকে প্রস্তুতি নিন, সাম্প্রতিক সময়ের একাডেমিক গাইডবইও আপনাকে সাহায্য করবে।
v “আন্তর্জাতিক” অংশে......
এখানে কমবেশি সবাই একইরকম পরীক্ষা দিবে তাই আপনাকে চেষ্টা রাখতে হবে এমন কিছু উত্তরপত্রে দেখানো, যাতে খুব সহজেই পরীক্ষকের নজর কাড়া যায়। সেক্ষেত্রে বিখ্যাত ব্যক্তিদের উক্তি, বই, পত্রিকা বা ম্যাগাজিনের উদ্ধৃতি কাজে লাগাতে পারবেন। নীল কালির কলম দিয়ে পয়েন্ট করে লিখলে পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণে কাজে লাগবে। পড়ার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে আপডেট তো থাকবেনই এর পাশাপাশি নীচের বইগুলো থেকে সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো নোট করে পড়লে এগিয়ে থাকবেন।
ক) বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর- তারেক শামসুর রেহমান
খ) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সংগঠন ও পররাষ্টনীতি- শাহ মু আব্দুল হাই
গ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলনীতি- মো আব্দুল হালিম
v “বাংলাদেশ” বিষয়ে ভালো করতে......
সবার আগে পত্রিকা ও ইন্টারনেট থেকে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করে তা মনে রাখা। লেখার প্র্যাক্টিস এই বিষয়ে খুবই দরকার, কারণ মাত্র পাঁচ নম্বর করে একেকটা প্রশ্নের জন্য, মোট চল্লিশটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। জানার গভীরতার চেয়ে এক্ষেত্রে আপনাকে এগিয়ে রাখবে গুছিয়ে লেখার যোগ্যতা। সর্বশেষ কোনো জরিপ বা সমীক্ষার উল্লেখ, পত্র-পত্রিকার নাম (সম্ভব হলে তারিখসহ), সমকালীন ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকর্তৃক প্রদত্ত তথ্য আপনার লেখাকে বৈচিত্রময় করে তুলবে, যেখানে অন্যরা শুধু বাংলা কথা লিখবে সেখানে আপনার খাতায় থাকবে সংখ্যা, ওটাই পরীক্ষকের মন জয় করতে সহায়ক হবে। এনসিটিবির মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ইতিহাস, ভূগোল, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইগুলো থেকে সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের পাশাপাশি পত্রিকার কলাম, অ্যাসিওরেন্স সিরিজের গাইড আপনাকে সহায়তা করবে। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলো বিস্তারিত পড়ে আত্মস্থ রাখা জরুরী।
v ইংরেজি বিষয়ে......
মৌলিক ইংরেজি জ্ঞানের বা দক্ষতার আসল পরীক্ষা হয় বিসিএস লিখিত অংশে। সারাজীবনের ইংরেজি গ্রামারের সব জ্ঞানের পরিশিলীত ব্যবহারের সুযোগ ঘটে অনুবাদ অংশে। এখানেই মূলত নম্বরের পার্থক্য তৈরি হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে ৫০ নম্বরের এক দীর্ঘ রচনা। মুক্তহস্তে লেখার যোগ্যতা যাচাই হবে এখানে। কাজেই, ইংরেজিতে ভালো নম্বর উঠাতে চাইলে স্বচ্ছ ও শুদ্ধ অনুবাদ অনুশীলনের বিকল্প তো নেইই, তার পাশাপাশি থাকতে হবে যেকোনো বিষয়ে ইচ্ছামতো লেখার দক্ষতা। যাদের দুর্বলতা আছে, তাদের ভয়কে জয় করতে প্রতিদিনকার পত্রিকা থেকে সম্পাদকীয় অংশটি অনুবাদ করতে পারেন। গ্রামার অংশে একেকবার একেক অধ্যায় থেকে প্রশ্ন হয় বলেই প্রায় সবগুলো সম্পর্কেই মৌলিক ধারণা রাখতে হবে। রচনা বই বা গাইড থেকে পড়তে গিয়ে সময় নষ্ট না করে বরং বাংলায় পড়ুন আর ইংরেজি লেখার গতি বাড়ান, তাতেই চমৎকার রচনা লিখতে পারবেন। বাংলাদেশ বা আন্তর্জাতিক অংশের মতো খুব বেশি তথ্য এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নয়, এর চেয়ে গুরুত্ব দিন লেখার সৌন্দর্য ও শুদ্ধতার দিকে।
v বাংলা ও ব্যাকরণে......
সাহিত্যিকদের নাম, পরিচিতি ও সাহিত্যকর্মের এই বিশাল জগত থেকে আপনিই চিন্তা করে বের করবেন, যেগুলো ব্যতিক্রমী, আলোচিত কিংবা জনপ্রিয় সেগুলোর সারসংক্ষেপ জেনে রাখবেন। ব্যাকরণের জন্য অ্যাসিওরেন্স বা প্রফেসর’স এর গাইডের পাশাপাশি প্রিলিতে পড়া বইগুলোও সঙ্গে রাখবেন, সব অধ্যায় না পড়ে সিলেবাস দেখে পড়লেই কমন পাবেন। বাংলা রচনা লেখার ক্ষেত্রে শুধু গতানুগতিক না লিখে তথ্যভিত্তিক করার চেষ্টা করবেন। রচনায় “ভূমিকা” বা “উপসংহার” কথার উল্লেখ না করে অন্যান্য পয়েন্টগুলো নীল কালির বলপয়েন্ট কলম দিয়ে লিখতে পারেন। প্রমিত বাংলা বানান, মাত্রার ব্যবহার ও লেখার সৌন্দর্যের দিকে লক্ষ্য রাখবেন।
সহায়ক বইগুলো-
ক) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- মাহবুবুল আলম
খ) প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম- বাংলা একাডেমি
গ) প্রবাদের উৎসসন্ধান- সমর পাল
ঘ) অগ্রদূত বাংলা- মফিজুল ইসলাম মিলন
সার্বিক ব্যাপারে কিছু কথা
§ যেহেতু অনেকবড় সিলেবাস, তাই প্রচুর পড়তে হবে। যাদের প্রথমবারের মতো প্রস্তুতি, তাদের পরিশ্রম করতে হবে আরও বেশি।
§ সিলেবাস যেহেতু আছে, তাই আগে সিলেবাসের অংশটুকু প্রস্তুত করে রাখুন। সময় পেলে ইচ্ছামতো আপনার গণ্ডিকে প্রসারিত করতে পারেন, অন্যথায় নয়।
§ সময় মাত্র এক সপ্তাহ, ১১০০ নম্বরের পরীক্ষা। কাজেই আপনাকে লেখার উপরই থাকতে হবে এই কয়েকটি দিন, লেখার অনুশীলনে যতো এগিয়ে থাকবেন, ততোই প্রতাশিত হবে আপনার ফলাফল।
§ প্রশ্নের মার্কস অনুযায়ী পরীক্ষার সময়কে ভাগ করে নিয়ে, সেই সময়ে লেখার প্র্যাক্টিস করুন।
§ হাতের লেখা সুন্দর হলে এগিয়ে থাকবেন অবশ্যই, তবে আপনার ভয়ও বেশি কারণ “আপনার ভুলগুলোও সবার আগে চোখে পড়বে”।
শুভকামনা সবার জন্য, আগামীর সকল ধাপ হোক আরও আনন্দময়।
No comments:
Post a Comment